তেমন যোগ্যতা তো এই গাঁও-গেরামের দেলবারের নেই। থানা-অফিস পর্যন্ত তার পা পড়েনি কোনো দিন। মেঘডুম্বুরের খেয়াঘাট টু বাড়ি। বাড়ি টু খেয়াঘাট। এই আধ মাইলের বেশি রাস্তা অতিক্রম করার ফুসরত আর এই জীবনে পেল কোথায়। মানুষজন হাটে-গঞ্জে অঢেল সময় অহেতুক ব্যয় করে আসে। একমাত্র দেলবারের নৌকার কাছে এসে তাদের দেরি সয় না। যাদের বয়স একটু বেশি তারা তো ধমকের স্বরে বলে, ‘দূর মিয়া, জোরে বাইতে পার না। তোমারে দিয়া কাম হবি না।’ তাতেও দেলবার চাচা রাগ করে না। ঠোঁটে বিড়ি রেখেই একটু হাসার চেষ্টা করে। হাসি-তামাশার ছলে দু-একজনকে বলে দেয়, ‘হাঁ, আমি যদুল কামের কামিলা অইতাম তাইলে কি আর মাঝির কাম করি।’ এ রকম করে সূর্য ওঠার পর থেকে কোনো কোনো দিন রাতের দুপুর পর্যন্ত এই মেঘডুম্বুরের ঘাটেই থাকতে হয়। মেঘডুম্বুরের খেয়ার চল এখন মরে গেছে। এমন এক সময় ছিল পঞ্চাশ গ্রামের লোকের যাতায়াতের একমাত্র রাস্তা এটাই ছিল। এই খেয়াঘাট পার হলেই ফরিদপুর থানা। তারপর ঘণ্টা দেড়েক টানা হাঁটলেই পাবনা সদর। এতদঞ্চলের কোর্ট-কাছারির চল সেই আমলে বেশিই ছিল। জমি-জমাসংক্রান্ত মামলা-মোকাদ্দমার কথা লোকমুখে এখনো প্রচলন আছে।
সুবিশাল বিল পাড়ি দিয়ে দিয়ে মেঘডুম্বুরের খেয়াঘাটটা বিল পাড়ের উত্তর-পূর্ব পাড়ের মানুষদের কাছে দূর থেকে মনে হয় ওই ঘাটের কাছে এসে আকাশের মেঘগুলো জমে রয়েছে। তাই বুঝি এর নাম হয়েছে মেঘডুম্বুর। তা ছাড়া তো তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি খুঁজে পাওয়া যায় না। কারণ, নদটার নাম বড়াল। তো মেঘডুম্বুর হওয়ার তো এই একটা কারণই হতে পারে।
এই ঘাটের সর্বক্ষণিক সাথি দেলবার চাচার মনটা সকাল থেকে খুব খারাপ। নিত্যদিনকার মতো লুঙ্গির উল্টো কোমরে এক প্যাকেট বিড়ি গুঁজে ঘাটে এসেছিল। পৌষ-মাঘ এই দুই মাসের খেয়ায় যে মানুষটি তার নৌকায় প্রথম পার হয়, তার নাম আলাউদ্দিন চোর। চোর বিশেষণটা আলাউদ্দিনের সঙ্গে এখন আর যায় না। সে একসময়কার ছেঁচড়া চোর। সে চুরি-বাটপারিটা গুটি কতক অবস্থাপন্ন মানুষদের বাড়িতেই করত। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চুরির পেশাটা সে ছেড়ে দিয়েছে। এখন সে হরদম গাছি হয়ে গেছে। শীতকালে খেজুরের রস বিক্রি করে। আর অন্য মৌসুমে বড় বড় গাছের ডালপালা ছাঁটে। তাতে তার সংসার বেশ চলে যায়।
শীতের সকালে বিল-বাঁওড়ে শীতের প্রকোপটা বেশি পড়লেও আলাউদ্দিনের কাছে শীত পালায়। গেরুয়া মোটা শাল কানপেঁচে বেঁধে শোঁ শোঁ গতিতে রওনা হয় খেয়াঘাটের দিকে। সরিষাক্ষেতের হলুদাভ ফুলের ওপর থেকে ঝরে পড়া শিশির আলাউদ্দিনের লুঙ্গির নিম্নভাগ ভিজিয়ে দেয়। খেয়াঘাটে এসে হাঁক ছাড়ে, ‘ভাই আইয়ো।’ আজ সকালে ঘাটে এসে নৌকায় উঠে প্রথমেই এক গ্লাস খেজুরের রস দেলবারকে দিয়ে বলল, ‘ভাই খাও। আজ বেচা-বিক্রি ভালো হবে। আজ স্কুলে খেলা আছে। রসও ভালোই পাইছি। আজ তো তোমার ব্যবসাও ভালো অইব।’ দেলবার কিছুই শুনল না তার কাছে। আলাউদ্দিন কথাগুলো হড়বড় করে বলে নৌকা থেকে নেমে গেল।
সত্যি সত্যি লোকে-লোকারণ্য। মানুষের ঢল ছুটছে। নৌকা ডুবুডুবু করে মানুষ পার করছে। বাচ্চা ছেলেদের মাথায় সবুজ কাপড় বাঁধা। সেই সবুজ কাপড়ের মাঝে লাল টকটকে রঙের বৃত্ত আঁকা। এতসব দেলবার চাচার বোঝার কথা নয়। বাচ্চা ছেলেমেয়েরা স্কুলে কত রকম খেলাধুলা করে থাকে। সাতপাঁচ ভেবে কোনো প্রশ্ন না করে আপনমনে মানুষ পার করে যাচ্ছে। এমন সময় দুজন মানুষ মোটরসাইকেল নিয়ে খেয়াঘাটে উপস্থিত। মোটরসাইকেলসহ নৌকায় উঠল। শুধু মোটরসাইকেলচারীদের নিয়ে দেলবার নৌকা ছেড়ে দিল। নৌকার প্যাসেঞ্জারে গায়ে আকাশি রঙের পাঞ্জাবি, গলায় কাশ্মীরি শাল পেঁচানো। বয়স ষাটোর্ধ্ব। শরীর বেশ মজবুত গড়নের। দূর থেকে বয়সটা বোঝার উপায় নেই। কাছে এলে ঠিকই বোঝা যায়। দেলবার লোক দুটোকে জিজ্ঞেস করল, ‘স্কুলে আজ কিসের খেলা আছে?’ লোক দুটো দেলবার চাচার কথা শুনে মনে হয় আকাশ থেকে পড়ল, এমন ভঙ্গি করে বলল, ‘তুমি জানোই না!’ এই বলে লোকদুটো কিছু সময়ের পর বলল, ‘মন্ত্রী সাহেব আইব। মন্ত্রী সাহেব আইব।’ দেলবার শুনে মাথা নাড়ল।
লোক দুটোর হাতে দামি সিগারেটে আগুন লাগানো। ধোঁয়া উড়ছে। মাঝেমধ্যে টান মারছে। আঙুল উঁচিয়ে ওগ্রাম এগ্রামের নাম বলছে। পানিতে বইঠার সপাং সপাং শব্দ হচ্ছে। দুজনের মধ্যে একজন বিলচাদো গ্রামটি দেখিয়ে একজন মানুষের নাম বলল। তার পর দেলবার চাচার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘অ হো, তুমি এখনো মিয়া বেঁচে আছ। তোমার নাম দেলবার না? তোমার নামটা দেলে গেঁথে আছে। তুমি না থাকলে সেদিন জানে বাঁচতাম না।’ আরেকজন উঠে বলল, ‘তুমি মিয়া বোকা না হলে আজ খেয়াঘাটে মাঝি হয়ে থাকা লাগে। এক দান মেরে দিলে তোমার চৌদ্দগুষ্টি খেয়ে পড়ে থাকতে পারত।’
এই কথাগুলোর মাথামুণ্ড দেলবার কিছুই বুঝল না। বিশেষ করে ‘এক দান’ শব্দের মানে। এরা কারা, এ কথাও জানতে চাইল না। এদের দিকে তাকিয়ে মনে করার চিন্তা করছে। কিন্তু খেয়াল করতে পারছে না।
লোক দুটোকে পাড়ে নামিয়ে দিল। মোটরসাইকেলসহ লোক দুটো চলে যাওয়ার সময় দেলবার চাচাকে বলল, ‘থাকো, এ রাস্তায় আর আসা হবে না।’
আসলে এরা কারা? এই ভাবনা ভাবতে ভাবতে দুপুর গড়িয়ে গেল। সন্ধ্যা নেমে এল। সমস্ত মানুষের আনাগোনা শেষ হলো। শীতের রাত। অল্প রাতেই মনে হয় অনেক রাত। মানুষ আসার সম্ভাবনা শেষ হলে দেলবার বাড়ি ফিরল। বাড়ি পৌঁছাতে পৌঁছাতেই তার শরীরটা আরও ভার হয়ে এল। আঙিনায় পা পড়তেই ছোট নাতি আশিস একটা চকচকে প্লেট নিয়ে তার কাছে এগিয়ে এল। মনে হয় এই লোকটাকে দেখানোর জন্য এই বাচ্চা ছেলেটা এত রাত পর্যন্ত জেগে আছে। বলল, ‘দাদা, আমি আজ এইটা দৌড়ে পেয়েছি।’ নাতিকে উদ্দেশ করে দেলবার বলল, ‘কিসের দৌড়।’ তখন নাতি বলে উঠল, ‘ওমা, আজ তো আমাদের বিজয় দিবস। আজকের এই দিনে তো আমরা স্বাধীন হয়েছি। তুমি না অনেকবার যুদ্ধের গল্প করেছ। যোদ্ধাদের তুমি খেয়ায় করে পার করে দিয়েছ। আজ সেই ষোলোই ডিসেম্বর। নাতির কথা শুনে দেলবার হকচকিতভাবে বলে, ‘আমি তো তারিখ-টারিখ বুঝি না। এই তো এই রকম শীতের মধ্যে দেশ থেকে পাকিস্তানি মিলেটারিরা চলে গেল।’
দেলবার দূর গ্রামের মানুষ। শহর থেকে অনেক দূরের। তাই এখনো তাদের বাড়িতে বিদ্যুতের আলো পৌঁছেনি। বড় নাতি সোহেল হারিকেনের ঘোলাটে আলোতে পড়তে বসেছে। হারিকেনের আলোর পাশে বসে দেলবার সমস্ত দিনের রোজগারে টাকা গুনছে। এদিকে নাতি গুনগুন করে বইয়ের পড়া পড়ছে। ‘একাত্তরের সময় পাক বাহিনীকে সহযোগিতা করে এদেশীয় রাজাকার আলবদর, আলশামস বাহিনী। এরা মানুষের বাড়িঘর জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ধন-দৌলত লুট করে নিয়ে যায়।’
এই পড়া শুনে দেলবার চাচার মনে হতচকিতভাবে লোক দুটোর চেহারা হারিকেনের আলোর মাঝে ভেসে উঠল। এরা বড় লুটেরা ছিল। সকালে লোক দুটোর সেই কথা ‘তুমি না থাকলে জানে বাঁচতাম না।’ এই কথাগুলো খুব ভালো করে মনে পড়ছে। লুট করার দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে উঠল। তারই নৌকায় চড়ে ধন-সম্পদসহ কত কিছুই যে নিয়ে গেল। মনে মনে ভাবছে, এই তো সেদিনের কথা। রথীনদের বাড়ি লুট করল। জানের ভয়ে লোকটা রাতের অন্ধকারে চলে গেল। আর এল না। সবকিছুই এই হারিকেনের আলোয় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।